বর্তমানে আমরা সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফর্মে নিজেদের শো অফ করতে গিয়ে নিজেদেরই কত ক্ষতি করে ফেলেছি সেটা কখনও ভেবে দেখেছো? প্রথমেই যেটা উঠে আসে সেটা হলো মনোরঞ্জন তার সঙ্গে উপরি পাওনা হিসেবে অনেক দূরের মানুষজনকে বন্ধু হিসাবে পাওয়া তার সঙ্গে মিমস আর ট্রেন্ডের জগতে গা ভাসিয়ে দেওয়া। তুমি হয়তো ভাবছো কেনো অনেক কিছু শেখার ও তো আছে তার বেলা কি হবে, কি তাই তো? এর উত্তরে আমি বলব হয়তো কিছু শেখার আছে বটে তবে সেটার সবটা কি আমাদের নিত্য জিবনে কাজে লাগে নাকি এক চিলতে ডোপামিনের (Dopamine) আশায় শেষ না হওয়া রিলস্ চেনের মধ্যে নিজেকে বেঁধে নেওয়া কোনটা?
এই ২০২৫ এর শেষের দিকের ডেটা বলছে সারা পৃথিবীতে প্রায় ৫.৬ বিলিয়ন অর্থাৎ গোটা বিশ্বের ৭০% মানুষ সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে। মজার ব্যাপার হলো এর মধ্যে মাত্র ৩৪% মানুষ কাজের জন্য এই সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে। আচ্ছা এইবার বলো ঠিক কি পরিমান ক্ষতি হয় আর কতটুকু আমরা লাভবান হয় এর সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে? বলতে পারবে? চলো তাহলে আমরা ধাপে ধাপে জানি ঠিক কতোটা ক্ষতি হচ্ছে, কতোটা লাভ হচ্ছে এই সোশ্যাল মিডিয়া থেকে এবং কিভাবেই বা নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখেই এই সব সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করব।
সোশ্যাল মিডিয়া বা সমাজিক মাধ্যম বেশি ব্যবহার করলে কি কি ক্ষতি হতে পারে?
সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে যতটা লাভ হয় বলে তুমি কল্পনা করো তার থেকে অনেক বেশি ক্ষতি হয়। এই ক্ষতি কিন্তু কোনো একটি বিশেষ বিষয়ের ওপর হয় না বরং তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে হয়, যেমন: (১) মানষিক ক্ষতি, (২)শারীরিক ক্ষতি এবং (৩) আর্থিক ক্ষতি। নিচে আমি ব্যাখ্যা করে দিচ্ছি
- মানসিক ক্ষতি: সোশ্যাল মিডিয়া বেশি ব্যবহার করতে থাকলে বাইরের জগতে বা বাস্তব জীবনে মনোযোগ কমে যায়, এর ফল স্বরূপ তুমি লোকজনের সঙ্গে মেলামেশা কমিয়ে দিয়ে নিজেকে একা করতে শুরু করবে। সাভাবিক ভাবেই একলা থাকতে থাকতে কিছু দিন পর ওভারথিংকিং শুরু হয়ে যাবে। অকারণে দুঃখ পাবে, শুন্যতা বোধ করবে, মুড সুইং হবে, মানসিক ক্লান্তি ধীরে ধীরে তোমার ওপর নিজের আধিপত্য জমাতে শুরু করবে। যেই তুমি একটু ডিজিট্যাল কারাগারে বন্দী হবে তৎক্ষণাৎ তুমি শেষ না হওয়া রিলস্ চেনের মধ্যে ফাঁসিয়ে ফেলবে যেখান থেকে বেরোনো মোটেও সহজ হবে না। এই ভাবেই তুমি হীনমন্যতার (Depression) শিকার হবে তোমার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা লোপ পেয়ে যাবে ফল স্বরূপ তুমি নিজেকে একদম একা পাবে, এমনকি নিজেকে মানসিক অসুস্থ বলেও মনে হতে পারে। রাগ ও বিরক্তি বৃদ্ধি পাবে, আবেগ নিয়ন্ত্রণে সমস্যা হতে পারে এমনকি বাস্তব সুখে আগ্রহ হারানোর সম্ভাবনাও হতে পারে।
- শারীরিক ক্ষতি: পেশী বা কঙ্কাল সমস্যা (Musculoskeletal problems), দৃষ্টি শক্তি বা চোখের সমস্যা (Vision Problem), ঘুমের সমস্যা, চুপচাপ বসে থেকে শরীরের সমস্যা, প্রদাহ (CRP), এমনকি কিছু ক্ষেত্র শারীরিক ক্ষত পর্যন্ত হয়েছে। এটাতে খুব বেশি বলার নেই কারণ এটা একদমই নরমাল যে মনসিক ভাবে অসুস্থ হলে তার প্রভাব শরীরেও পড়বে। অন্যতম কারণ হলো তুমি বেশিক্ষণ ডিজিট্যাল স্ক্রীনের দিকে তাকিয়ে থাকলে তোমার চোখ তো আর শুনবে না, খুব ধীরে ধীরে চোখের ক্ষমতা কমতে শুরু করবে।
- অর্থিক ক্ষতি: এটার মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায় যখন তুমি তুলনামূলক মানসিকতা বা (Comparison Trap) গড়ে তোলো। সোশ্যাল মিডিয়া তে লোকজন শো অফ করতেই আসে বেশিরভাগ কিন্তু তুমি সেই ফাঁদেই পড়ে যাও। For example - “কেউ কোথাও ঘুরতে গিয়ে ছবি বা ভিডিও শেয়ার করেছেন বা কোনো দামী পন্য কিনেছে (বা কোনো পণ্যের বিজ্ঞাপন) তুমি সেটা দেখা মাত্র কল্পনা করতে শুরু করে আমিও একটা নেবো ওই রকম জিনিস, বা ওই ছেলেটা ওখানে বেড়াতে গেছে আমিও যাবো” তুমি আদৌ কিন্তু দেখবে না সেই বস্তুটার তোমার সত্যি প্রয়োজন আছে কি না। তাছাড়া সোশ্যাল মিডিয়া বেশি ব্যবহার করতে গিয়ে সেলফ এমপ্লয়রা সময় নষ্ট করে কিছু টাকা কম ইনকাম করবে আর অফিস কর্মীরা বসের রোষে পড়বে।
সোশ্যাল মিডিয়া বেশি → মন অস্থির + শরীর নিষ্ক্রিয় + জীবনের গভীর আনন্দ কমে যায়। আসলে সোশ্যাল মিডিয়া হলো নোনা জলের মতো বাবা জীবন, তুমি যতই পান করো, ততই তৃষ্ণা বাড়ে; কখনোই মন ভরায় না। সুতরাং খুব সাবধানে।
সোশ্যাল মিডিয়া থেকে দূরে থাকতে কি কি পদক্ষেপ আমরা বাস্তবায়িত করতে পারি?
সমস্যার কথা তো অনেক হলো কিন্তু বিড়ালের গলায় ঘন্টাটা বাঁধবো কিভাবে, তাইতো? চলো এইবার বলি কিছু প্র্যাকটিক্যাল সমাধানের কথা। এখানে বলে রাখি আমাদের ফোন হলো সবথেকে কাছে থাকা সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করার মেইন কালপ্রিট কিন্তু ফোন ছাড়া চলা বর্তমানে সম্ভব না তাই কি কি প্রবলেম ফোনের মাধ্যমে আমরা সলভ করতে পারি সেটা জানতে হবে। যেমন:
-
ডিজিট্যাল ফোন লক: নোটিফিকেশন বন্ধ করে রাখো, অ্যাপ আনইনস্টল করা, ওয়েব ভার্সন ব্লক করা, স্ক্রিন টাইম এর সীমা নির্ধারণ করা, অ্যাপ টাইমার ব্যবহার শুরু করা, ডেটা ব্যবহারে লিমিটেশন সেট করা, গ্রেস্কেল মোড চালু করা, লগআউট করে রাখা, ইত্যাদী এইগুলো আগে করতে হবে।
- বিকল্প বিনোদন নির্ধারণ করা: যখন ফোন ছিলো না তখন মানুষ কি করত? এটা মাথায় রেখে কিছু বিকল্প বিনোদনের মাধ্যম ব্যবহার করা শুরু করো। For example: TV দেখা, জানালার পাশে বসে গান শোনা বা প্রকৃতির রঙিন দৃশ্য দেখা অথবা কোনো বই পড়া।
- কিছু বিশেষ হবি তৈরী করা: বিশেষ হবি বলতে কিন্তু কোনো ডিজিট্যাল স্ক্রীনের ওপর কোনো কাজ না অথবা গান শোনা, গাওয়া বা বই পড়াও না। উদাহরণ স্বরূপ তুমি রান্না করতে চেষ্টা করতে পারো যদি কিছু নাও জানো নিধিন পক্ষে এক কাপ চা, তুমি গাছ লাগিয়ে একটি বাগান করার চেষ্টা করতে পারো কিংবা মাটি দিয়ে কিছু বানানোর চেষ্টা।
- বাস্তব জীবনে ইন্টারেস্ট বাড়ানো: বন্ধুদের সঙ্গে ফোনে কথা না বলে মুখোমুখি দেখা করতে যাও সময় কেটে যায়। পারলে স্কুলের বন্ধুদের খোঁজ করে মেলামেশা বাড়াতে পারো। পাড়ার মোড়ে থাকা চায়ের দোকানে এক কাপ চা খেতে খেতে অচেনা মানুষদের সঙ্গে আলাপচারিতা বাড়াতে পারো।
- নিরাপদ দুরত্ব বজায় রাখা: নিজের ফোন ব্যবহারের স্থিতি লক্ষ্য করে নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করো। For example - ঘুমানোর আগে ও পরে এক ঘন্টা কোনো ফোন ব্যবহার না। যেখানে ১০ বার ফোন আনলক করতে সেখানে ৫ বার করো। ফোনের প্রতি অলসতা বানাও, এমন জায়গায় ফোন রাখো যেটা আনতে যেতেই বিরক্ত লাগে। জানি এটা একটু অদ্ভুত শোনাচ্ছে কিন্তু নিজেকে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে বাঁচাতে এই পদক্ষেপের সম্মুখীন নিজে হয়েছি তাই বলছি।
- আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে যোগাযোগ (Spirituality): সকাল সন্ধ্যা মেডিটেশন করা শুরু করো, প্রথমে ১০ মিনিট, পরের দিন ১৫ মিনিট এইভাবে অভ্যেস করলে ব্যাপারটা সহজ হবে। এর সঙ্গে যদি সম্ভব হয় মাঝে মধ্যে কাছের কোনো মন্দিরেও ঘুরে আসতে পারো তবে অবশ্যই ফোন ছাড়া যেও, টা না হলে আবার শেলফি তুলে সমাজ মাধ্যমে ছেড়ে like, comment, share এর আশায় বসে থাকবে মানে সেই চেইন শুরু।
- প্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত: কাছে পিঠে যদি কোনো ছোটো জঙ্গল থাকে তাহলে সেখানে গিয়ে গাছেদের স্পর্শ করে প্রকৃতি কে অনুভব করার চেষ্টা করতে পারো। এই ধরনের কাজ গুলি খুব দ্রুত মনকে শান্ত করতে পারে।
আমি কিন্তু প্রথম চেষ্টা করে পারিনি বরং ধৈর্য সঙ্গে নিয়ে ধীরে ধীরে পেরেছি এবং এই পন্থা অবলম্বন করলে আমি নিশ্চিৎ তুমিও সফল হবে। মনে রাখবে তোমার জীবন কোনো ডিজিট্যাল স্ক্রীন একদমই না। ওটা একটা খেলনা। বাস্তবে আনন্দ নেওয়াটাই শ্রেষ্ঠ স্মৃতি হয়ে মনে রয়ে যাবে। এই সমাধান যদি তোমার কাজে আসে তাহলে একটি কমেন্ট করে জানাও।
আরোও পড়ুন